গল্প - সুহাসিনী পর্ব ৪

  

পর্ব ৪ 



স্ত্রী মারিয়া ছাড়া জীবনে প্রথম কারও সাথে শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল আমার। সুন্দরী মেয়ে দেখলেই ভেতর ভেতর উত্তেজনা অনুভব করার মতন পুরুষ আমি না। কিন্তু সুহাসিনী তো শুধুই সুন্দরী ছিল না, ও ছিল একটা চুম্বুক, যেই ওকে দেখবে ওর প্রতি চুম্বুকের মতন আকর্ষণ অনুভব করতে থাকবে,আমিও তাই করেছিলাম। আর যখন সুহাসিনীর মতন একজন পূর্ণাঙ্গ নারী নিজে থেকে প্রেম নিবেদন করে তখন সেই লোভ সামলানোটা একেবারেই অসম্ভব।


আমার স্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুতে আমি মানুষিক ভাবে ভেঙ্গে পরলেও একটা ব্যাপার আমাকে ভাবাতে লাগল। দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে আমি দেশের বাইরে, দেশের ভেতর আমার স্ত্রী আর সন্তানদেরকে না কেউ চেনে আর না জানে তাদের সাথে যোগাযোগের কোন উপায়। তাহলে মারিয়া কিভাবে জানতে পারল, যে আমি ওর সাথে প্রতারনা করেছি। গতকাল বিকেলেই তো ওর সাথে কথা হয়েছিল আমার। কোন রাগ, অভিমান অথবা কষ্টের ছোঁয়াটুকুও প্রকাশ পায়নি ওর কথায়। তার থেকেও বড় কথা মারিয়া জার্মানি থেকে ডিগ্রি নেয়া একজন শিক্ষিত মেয়ে, নিজের স্বামীর বিরুদ্ধে এই রকম কোন খবর শুনলেও নিজে থেকে যাচাই না করে আত্মহত্যা করার মতন বোকা সে কখনই না। তাহলে কি এমন হল যে তাকে আত্মহত্যা করতে হল, আর সেই দায়ভার এমনভাবে চাপিয়ে দিল আমার ওপর, যেন সে সকল বিষয় সম্পর্কে অবগত ! আফসোস চিন্তাটা বেশিক্ষণ করতে পারালাম না, যখনই মনে পড়ল আমার স্ত্রী মারিয়া আর নেই, আমার সব যুক্তিগুলি বিক্ষিপ্ত হতে লাগল। আমার ভেতরটা হুহু করে উঠল, চোখের পানি পড়তে পড়তে থেমে গেল একটা সময়, আর সেই সাথে কখন যে আমার চোখ লেগে আসল, সেটা নিজেও জানি না।��~


একদম চুপ করেই বসে ছিলাম আমি। সুহাসিনী হেঁটে হেঁটে আমার কাছে এসে বসল। ওর হাতটা আমার হাতের উপর রাখতেই আমি তাকালাম ওর দিকে। ও একটা হলুদ শাড়ি পড়েছিল, আমি তার সেই মায়াবী নীল চোখের দিকে তাকালাম। 

— কি হয়েছে? সুহাসিনী বেশ আদর করে প্রশ্নটা করল আমাকে। 

আমি কিছুই বলতে পারলাম না। ফ্যালফ্যাল করে ওর দিকে চেয়ে থাকলাম। ঠোটে একটা মৃদু হাসি নিয়ে ও বলল “আমাকে দেয়া প্রতিজ্ঞার কথাটা মনে আছে তো।” 

ওর কথায় অবাক হয়ে আমি বললাম “কিসের প্রতিজ্ঞা ! ! ” 

সুহাসিনী যেন আমার থেকেও বেশী অবাক হয়ে গেল, তারপর বলল “ওই যে, আমাকে একটা সন্তান দেবার প্রতিজ্ঞা ” 

সুহাসিনীর কথা শুনে আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। সে রাতে প্রেম বিনিময়ের আগে সুহাসিনী আমাকে এই কথাটাই বলেছিল, এর অর্থ সুহাসিনী কি বোঝাচ্ছে? আমি বুঝতে পারলাম না। 

একটা যুবতী মেয়ের দিনের পর দিন অতৃপ্ত থাকার কারণেই সে আমকে এই প্রস্তাব দিয়েছে, তখন পর্যন্ত এটাই মনে করছিলাম আমি। আমি সুহাসিনীকে বললাম। 

— দেখ আমি এখন এসব করার মানসিকতায় নেই, আমার স্ত্রী …” 

“আমাকে একটা সন্তান না দিয়ে আপনি কোথাও যেতে পারবেন না।” আমার কথাটা কেড়ে নিয়ে বেশ কড়া করে কথাটা বলল ও। 

আমিও বেশ রেগে গিয়েই বললাম, “মানে কি? আমি কি তোমাকে সন্তান দেবার জন্য এখানে এসেছি।” 

— আমাকে দেয়া প্রতিজ্ঞা পূরণ আপনাকে করতেই হবে, নিজের সন্তানদের বাঁচাতে চাইলে আমাকে একটা সন্তান দিন। তারপর আপনি মুক্ত। ওর সুন্দর নীল চোখ হঠাৎ করেই কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে গেল, যা দেখে আমি সত্যিকারেই ভঁয় পাচ্ছিলাম। 

সুহাসিনী এই কথা বলার পর মুহূর্তেই আমি দেখতে পেলাম, আমার দুই সন্তান বিরাট একটা বাড়ির ছাদের ঠিক কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। তারা দুজন নিচের দিকে তাকাচ্ছে। আমি দূর থেকে চিৎকার করছি আর ওদের সরে আসতে বলছি, কিন্তু আমার চিৎকার ওদের কান অব্ধি পৌঁছাছেনা। আমি দৌড়রাচ্ছি । কিন্তু ওদের কাছে যেতে পারছি না।


এমন সময় একটা ধাক্কায় এই স্বপ্ন ভেঙ্গে লাফিয়ে উঠলাম আমি। উঠেই আমার পাশে অন্ধকে দেখে বেশ ঘাবড়ে গেলাম। আমাকে শান্ত করতে গিয়ে অন্ধ বললেন “জোরে জোরে শ্বাস নিন বড় সাহেব, কোন দুঃস্বপ্ন দেখেছেন নিশ্চয়ই” 

আমি চারদিক তাকিয়ে দেখলাম, সন্ধ্যা হয়ে আসছে। অবাক হয়ে গেলাম আমি, আমি কি তাহলে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুমিয়ে ছিলাম? এতক্ষণ ধরেই কি এই স্বপ্নটা দেখছিলাম আমি ? আমার কাছে যেন একটা তন্দ্রার মতন লাগছিল। স্বাভাবিক হতে আমি বেশ খানিকটা সময় নিলাম। স্বাভাবিক হবার পরপরই আমি অন্ধকে জিজ্ঞাস করলাম “সুহাসিনী কোথায় ?” 

— কেন ? আপনি জানেন না? এতক্ষণ তো আপনারই সাথে ছিল। আপনার স্বপ্নে” বেশ তাচ্ছিলা দেখিয়ে কথাটা বলল এই অন্ধ। কিন্তু এই অন্ধ কিভাবে জানল আমি সুহাসিনীকে স্বপ্ন দেখছিলাম। বিছানা থেকে নেমে আমি রিয়াদের ঘরে গেলাম। ঘরের সামনে দাঁড়াতেই সুহাসিনীকে দেখলাম আমি। ও একটা হলুদ রঙের শাড়ি পড়ে বসে আছে, ঠিক স্বপ্নে দেখা শাড়িটার মতন। আমাকে দেখেই মুচকি হেসে ও ঘর থেকে বের হয়ে এল। সুহাসিনী আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে ছিল ঠিক যেমনটা কিছুক্ষণ আগেই আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম। ওর এই চাহনিতে আমার ভেতরটা মুচড়ে উঠল।


এমন সময় আমার এই মোহ ভেঙ্গে ঠুক ঠুক লাঠির আওয়াজ করতে করতে আমার ঘর হতে অন্ধকে বের হয়ে আসতে দেখলাম। আমাকে অতিক্রম করতেই সে ফিসফিস করে বলল “আমার কথা ঠিক আছে তো বড় সাহেব” এটা বলেই সে নিচে নেমে গেল। অন্ধের প্রতি সুহাসিনীর কোন প্রকার মনোযোগ লক্ষ্য করলাম না আমি। আমি অন্ধের পিছন পিছন ছুটতে লাগলাম। স্বপ্ন হলে কি হবে, আমার মন বলছিল আমার সন্তানরা বিপদের মধ্যে রয়েছে, যে করেই হোক ওদেরকে বাঁচাতে হবে আমাকে। ��~


আমাকে নিয়ে আমার মায়ের পাশের ঘরটাতে ঢুকতেই হঠাৎ যেন বোবা হয়ে গেলেন এই অন্ধ। তিনি কি দেখাতে চাইছে সেটা পর্যন্ত বললেন না আমাকে। আমি তাকে একটার পড় একটা প্রশ্ন করতে থাকলাম, কিন্তু তিনি এতটাই চুপ হয়ে গেলেন যে আমার সত্যিই মনে হচ্ছিল উনি বোবা হয়ে গেছেন।


কি করব কিছুই মাথায় আসছিল না আমার। আমি ঘরটার চারপাশ দেখতে আরাম্ভ করলাম। এই ঘরটাতেই ছোট বেলায় ওই মূর্তিটাকে দেখে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম আমি। ঘরটা আগের তুলনায় সামান্য ছোট মনে হচ্ছিল আমার কাছে। ঘরের দেয়ালগুলি লাল কাপড় দিয়ে মোড়ানো ছিল। ঘরটার একটা কোনায় ছোট ছোট টেবিলের মতন কাঠের আসবাব রাখা ছিল আর সেগুলোর ওপর অনেকগুলি কাগজ, খাতা, বই আর কলম। ঘরের ওপর কোনে তাকাতেই হঠাৎ করে আমার কলিজাটা ধুঁক করে উঠল। ছোট বেলায় দেখা সেই মূর্তিটার কথা মনে পড়ে গেল আমার। আর ঠিক এমন সময় ঘরের ওই কোনার দেয়াল থেকে একটা গুম… গুম… আওয়াজ শুনতে পেলাম আমি। আওয়াজটা শুনতেই অন্ধ ভঁয়ে পেছনে সরে একেবারে দরজার কাছে চলে গেলেন । এত গম্ভীর, এত কঠিন আর এত ভয়ার্ত আওয়াজ আমি আমার এই জীবনে শুনিনি কখনো। ভয় আর আতঙ্কে আমার পা কাঁপতে আরাম্ভ করল। আওয়াজটার তীব্রতা আস্তে আস্তে বাড়তে আরাম্ভ করল। আওয়াজটা এমন ছিল যেন মনে হচ্ছিল কোন হিংস্র প্রাণী শিকারের ওঁত ডাকছে। ভঁয়ে ভঁয়ে সামনের পা বাড়লাম আমি, জানি না কোন জিনিস আমাকে এই দুঃসাহস দিয়েছিল কিন্তু আমি এক পা এক পা করে দেয়ালটার সামনে এগুচ্ছিলাম। দেয়ালটার একদম সামনে আসতেই লাল মোড়ানো কাপড়ের পেছনে সেই মূর্তিটাকে আবার দেখতে পেলাম আমি। সেই কুৎসিত কাল বীভৎস মূর্তি। যার চোখগুলো ঠিক বহু বছর আগের মতন করেই বাঁধা ছিল একটা লাল কাপড় দিয়ে। কিন্তু এবার এই জড় মূর্তিটা যেন আর আগের মতন জড় ছিল না, সে যেন এখন জীবন্ত একটা স্বত্বাতে পরিণীত হয়ে গেছে। নড়াচড়া না করলেও আমি অনুভব করতে পারলাম মূর্তিটা এখান থেকে বের হতে চাইছে, তার সমস্ত শক্তি দিয়ে ছুটে আসতে চাইছে সে। ওর কাল জিহ্বাটা দেখে কেউ বলতে পারবে না যে এটা মাটির তৈরি কিছু। দেখে স্পষ্ট মনে হচ্ছিল সেটা একদম বাস্তব। মূর্তিটার জীবন্ত হবার প্রমাণ তার এই আওয়াজেই বোঝা যাচ্ছিল। 

শরীর কাটা দিয়ে উঠল আমার, ভঁয়ে পেছনে তাকালতেই আমি যেন আরও শিউরে উঠলাম। আমার পেছনে দরজার সামনে অন্ধ নেই। চারপাশে তাকালাম আমি তবুও তাকে দেখতে পারলাম না। আমি এক দৌড়ে বের হয়ে গেলাম এই ঘর থেকে। 

�~


আমার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা যা আমি অতীতে উপেক্ষা করে গিয়েছিলাম, সেগুলি আমার দৃষ্টিগোচর হতে আরাম্ভ করল। ওই ঘরটা থেকে বের হতেই দেখলাম অন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি হুড়মুড় করে বের হতেই সে আমাকে হাত দিয়ে থামিয়ে দিল তারপর ঘরের দরজাটা বন্ধ করে ইশারায় আমাকে শব্দ করতে নিষেধ করল। হাঁটু গেঁড়ে মাটিতে বসে বাড়ির মেঝেতে পাশাপাশি টানা খুব সূক্ষ্ম তিনটা দাগ কাটা লাইন আমাকে দেখাল সে। আমি লক্ষ্য করলাম কাটা দাগগুলি পুরো বাড়ি জুড়ে রয়েছে। আরও লক্ষ্য করলাম অন্ধ আমাকে এই দাগের উপর থাকতে ইশারা করছে। আমার ভঁয় আর আতঙ্ক তখনও কাটেনি, বুক তখনও আমার ধরফর করছিল। অন্ধের সাথে আমিও এই দাগ বরাবর চলতে আরাম্ভ করলাম। আর অন্ধ তার লাঠি দিয়ে সেই দাগ অনুসরণ করতে করতে সামনে যেতে থাকল।


হেঁটে রিয়াদের ঘরের সামনে আসতেই বুঝতে পারলাম সুহাসিনী আমাকে একদমই লক্ষ্য করছে না। এই দাগটা নিচের ঘর থেকে শুরু হয়ে আমার ঘরের সামনে এসে থেমে গেছে আর আমার ঘরটার চারিদিকে যেন একটা বলয়ের মতন করে আবৃত করে রেখেছে।


“বড় সাহেব। ঘুমানোর আগে এই কাপড়টা চোখে বেঁধে ঘুমাবেন। তাহলে সুহারা আপনার মস্তিষ্কের কাছে আসতে পারবে না। মেঝের দাগ তিনটি দেখিয়ে দিয়ে সে বলল। আপনার ঘর আর নিচের ওই ঘর এই দুটি ঘরেই সুহারা সশরীরে প্রবেশ করতে পারবে না, এই দুই ঘর আপনার মা বন্ধ করে রেখেছে। আপনার রাতের খাবার এখানেই দিয়ে যাব। কিন্তু সাবধান এই বাড়ি থেকে বের হবার চিন্তা ভুলেও করবেন না কখনই। এখন আর আপনার সে সুযোগ নেই।” একদম ফিসফিস করে কথা গুলো বললেন তিনি। তারপর আমার হাতে লাল কাপড়টা দিয়ে আস্তে আস্তে নিচে চলে গেলেন।


এমন সব জিনিস আমার সামনে ঘটছে যা থেকে মুক্ত হতে এসেছিলাম আমি। ছোট বেলায় যার কর্মকাণ্ডে পালিয়ে গিয়েছিলাম আজ সেই ব্যাপারগুলি ঘটছে আমার সাথে। যেই বাড়ি থেকে জীবন নিয়ে চলে গিয়েছিলাম আজ আমি সেখানে বন্দি।


রাত ১২ টা, আজকে আমি এতটাই ঘাবড়ে ছিলাম যে চোখের পাতা ফেলার সাহসটুকু আমার হচ্ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ কিভাবে বিছানায় মাথা রাখবে। পাশের ঘরে সুহাসিনী যে আমার সন্তানদেরকে খুন করার হুমকি দিচ্ছে আর ঘরের নিচে আটকে থাকা একটা জীবন্ত পিশাচ। অন্ধের দেয়া কাপড়টা চোখে বেঁধে, আমি ভেতর ভেতর কাঁদতে আরাম্ভ করলাম। কিছু একটা ছিল এই কাপড়ে, কাপড়টা চোখে লাগানোর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লাম আমি।


আর ঠিক মাঝ রাতে আরও একটা স্বপ্নে ঘুম ভাঙ্গল আমার। যেখানে আমি আমার মাকে দেখতে পেয়েছিলাম। উনি তার দুই হাতে দিয়ে আমাকে একটা সংখ্যা বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন। সেই সংখ্যাটা ছিল ৩৪। যে সংখ্যার ইশারা মা মৃত্যুর সময়ও করেছিলেন। উনার ঝুলন্ত লাশেড় হাতের আঙ্গুল দিয়ে তার ডান হাতে তিন আর বাম হাতে চার ইশারা করা ছিল।


ঘুম ভেঙ্গে উঠে আমি আমার চোখের কাপড় বাঁধা অবস্থায় বিছানা থেকে উঠে বসে রইলাম। জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকলাম আর ভাবতে থাকলাম। এই ৩৪ লেখাটা আমি আরও এক জায়গায় দেখেছি। কিন্তু সেটা কোথায় কোন ভাবেই মনে করতে পারছিলাম না আমি। ঠিক এমন সময় কাঁধের উপর একটা উষ্ণ হাতের স্পর্শে চিৎকার করে উঠলাম আমি। ��


চলবে … ��

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন