গল্প - সুহাসিনী পর্ব – ৫

পর্ব – ৫ 



নারী দেহের সন্ধান পেলে উন্মাদ পুরুষেরা যেমন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে, কাঁচা মাংসের গন্ধে খেপা জানোয়ারেরা যেমন হিংস্র হয়ে যায়, তার থেকেও হাজার গুণে ভয়ঙ্কর আর হিংস্র হয় যখন কোন বন্ধী পিশাচ তার মুক্তির পথ খুঁজে পায়। 

শিকারি পশুর সামনে থাকা শিকারটাই শুধু জানে সেটা কতটা ভয়াবহ আর মর্মান্তিক। আর আমিই ছিলাম সেই শিকার।


সে রাতে ঘুম থেকে উঠার পরে নিজের কাঁধের ওপর কারও একটা হাতের স্পর্শ অনুভব করেছিলাম আমি। চিৎকার করে আমার চোখের উপর বাধা লাল কাপড়টা খুলতে যাব ঠিক এমন সময় আমার ঘরের দরজা থেকে বেশ দূরে অন্ধের গলা শুনতে পেলাম আমি। 

“কোনভাবেই চোখ খুলবেন না বড় সাহেব, যত কিছুই হয়ে যাক আপনি তাকাবেন না ওর দিকে”

তারপর বেশ কিছুক্ষণের নীরবতা, আর তারও কিছুক্ষণ পর সুহাসিনীর সেই মিষ্টি কণ্ঠ

--- চোখ খোল ফরহাদ, একবার দেখ আমাকে, একটা বারের জন্য তাকাও আমার দিকে... এটাই ছিল আমার, সুহাসিনীর কাছ থেকে শোনা সর্বশেষ মনুষ্য কণ্ঠ।


আমি বিছানার উপর চোখ বন্ধ করে বসে ছিলাম। এর মধ্যেই হঠাৎ হঠাৎ মনে হতে লাগল কেউ আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, আবার কেউ যেন আমার পেছনে দাড়িয়ে আমাকে ধরার চেষ্টা করছে । দরজার বাইরে থেকে উদ্ভট সব আওয়াজ, শব্দ শুনতে পারছিলাম। আতঙ্কে শরীর ঘেমে সম্পূর্ণ ভিজে গিয়েছিল আমার। আমি বেশ কয় বার অন্ধ চাচাকে ডাকলাম, কিন্তু কোন সাড়া পেলাম না তার। কেন তিনি সাড়া দিচ্ছেন না? আর তার কি হয়েছে? কিছুই বুঝতে পারছিলাম না আমি। যদিও আমি চোখে দেখতাম, কিন্তু সে সময় চোখ বাধা থাকার কারণে অন্ধ হয়েই গেছিলাম। অন্ধের মতন একবার সামনে, একবার পিছনে ঘুরতে থাকলাম আমি। আমি উপলব্ধি করতে পারছিলাম কেন সুহাসিনী আর রিয়াদের চোখের উপর এই লাল কাপড় বাধা ছিল আর কেনই একজন অন্ধ মানুষকে আমার মা সুহাসিনীকে পাহারা দেবার জন্য রেখেছিলেন । কিন্তু এখন এই উপলব্ধি হয়ত আর কোন কাজে আসবে না। আর এখানে এভাবেই হয়ত আমি মারা যাব। তাই নিজে থেকেই মৃত্যুর প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। 

~


রাত পার হয়ে সূর্যের উষ্ণ আলো যখন জানালা দিয়ে আমার শরীরে এসে পড়ল,হঠাৎ নিজেকে জীবিত মনে হয়ে লাগল। কিন্তু তখনও চোখের এই বাঁধন খোলার মতন সাহস পাচ্ছিলাম না আমি। আমি অসহায়ের মতন ডাকতে আরাম্ভ করলাম “চাচা... চাচা…" অন্ধ চাচার কোন সাড়া নেই। আমি এবার পাগলের মতন আমার প্রতিবন্ধি ভাই রিয়াদকে ডাকতে আরাম্ভ করলাম “রিয়াদ... , রিয়াদ…" যদিও আমি জানতাম, আমার এই ডাক ওর কান অব্ধি কখনোই পৌঁছাবে না।


প্রচুর ঘাবড়ে যাবার কারণেই হয়ত শব্দটা আমি এতক্ষণ ধরেই উপেক্ষা করছিলাম। শব্দটা টের পাবার সাথে সাথেই আমি চুপ করে কান খাড়া করে রাখলাম। সামান্য নীরবতা, তারপর মেঝেতে মৃদু ঠুক ঠুক একটা আওয়াজ, তারপর আবার নীরবতা আবার সেই আওয়াজ। এই আওয়াজটা আমার চেনা, এটা অন্ধ চাচার লাঠির আওয়াজ। উনি নিশ্চয়ই আমাকে যাবার সংকেত দিচ্ছেন। জানে পানি আসা কথাটা কি জিনিস সেটা একদম পাই টু পাই বুঝতে পেরেছিলাম আমি।


আমি মেঝেতে হাত আউরাতে থাকলাম, মেঝের কাটা দাগটা অনুসরন করে সামনে যেতে হবে আমাকে। দাগটা বুঝতে পেরে ঘরের বাইরে পা রাখলাম আমি, আমার চোখ তখনও কাপড়টা দিয়ে আটকানো।


ঘরের বাইরে পা রাখতেই একজন আমার পাশে পাশে চলতে লাগল যা আমি স্পষ্ট আনুভব করতে পারলাম। আমার পাশে এই নিঃশব্দ চলতে থাকা পথচারী যে সুহাসিনী ছাড়া আর কেউ হতে পারে না সেটা বুঝতে কোন অসুবিধা হল না আমার। আমি সর্ব সাবধানে এক একটা পা ফেলছিলাম আর সেই সাথে বুকের ভেতর হৃত্স্পন্দনের শব্দটা শুনতে পাচ্ছিলাম। সিঁড়ির গোড়ায় আসা মাত্র অন্ধ চাচার হাতের স্পর্শ টের পেলাম আমি। আমি কিছু বলার আগেই সে হুসস করে উঠল।


~


অন্ধ আমাকে নিয়ে আবার সেই মূর্তির ঘরটাতে ঢুকলেন, তারপর নিজেই আমার চোখ থেকে কাপড়টা খুলে নিলেন। গতকাল রাতে এই ঘর থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম আমি। আজকে আবার আমাকে এখানে আনার উদ্দেশ্যটা আমি বুঝতে পারলাম না, এই ঘরে যে একটা টু শব্দও করা যাবে না সেই অভিজ্ঞতা আমার ইতিমধ্যে হয়েছিল।


ঘরের এক কোনে ছোট ছোট টেবিলের মতন আসবাবের উপরে রাখা কাগজ গুলোতে চোখ পড়তেই একটা ব্যাপারটা মনে পড়ল যা আমি গতকাল রাত থেকেই মনে করার চেষ্টা করছিলাম। গতকাল রাতে এখানেই কোন একটা কাগজে ৩৪ সংখ্যাটা লেখা দেখেছিলাম আমি। বড় বড় শ্বাস নিয়ে ধীর গতিতে কাগজগুলি ওলটাতে থাকলাম আমি। যেখানে বিক্ষিপ্ত ভাবে কিছু কথা লেখা ছিল…


~


সুহাসিনীকে দেখা মাত্র আমি তাকে চিনতে পেরেছিলাম, এ কোন সাধারণ মেয়ে নয়, এ সুহারের বংশধর।


আমি জানি না আমি কি করতে যাচ্ছি। এত বড় ঝুঁকি আমার নেয়াটা ঠিক হচ্ছে কিনা?


ডাইন সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়ংকর এক জাতের নাম সুহার। যারা ছিল পিশাচ সুহারের বংশভূত। পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত যত প্রেত শাসক রয়েছে তারা সকলেই কম বেশি চিন্তিত থাকে এই জাতটাকে নিয়ে। নীল বর্ণ চোখ আর অপরূপ আকর্ষণীয় সৌন্দর্যই এদের সনাক্তের একমাত্র উপায়।


পূর্ব প্রেত শাসকেরা এই পিশাচকে একটা মূর্তিতে বন্দী করে রেখেছে বহু বছর ধরে। আর তখন থেকেই এই পিশাচকে মুক্ত করতে লেগে আছে ওর বংশধরেরা। এই ডাইনদের সংখ্যা এখন পর্যন্ত প্রেত শাসকদের কাছে অজ্ঞাত। একটা নতুন নিষ্পাপ জীবনই এই পিশাচকে মুক্তি দিতে পারে।


একটা মনুষ্য সন্তান নিজের ভ্রূণে আনার ৩৪ দিনের মাথায় এই ভ্রূণকে এই মূর্তির কাছে বিসর্জন দিলেই জেগে উঠবে এই পিশাচ। যা কোন ভাবেই হতে দেয়া যাবে না। সান্ত্বনা একটাই কেউ চাইলেই মা হতে পারে না, সে যেই হোক না কেন। মানুষ অথবা ডাইন।


সুহাসিনীর সম্মোহন এবং স্বপ্নচারন সকল ক্ষমতাকে বন্ধী করার পরও মনে হচ্ছে এই পিশাচ বের হয়ে আসবে। দিন দিন কিভাবে যেন জীবন্ত হয়ে আসছে এই মূর্তি। কিভাবে তা আমার জানা নেই। কিন্তু কোন একটা কিছু আছে যা আমার চোখের অগোচরে হচ্ছে!


পিশাচটা আরও জীবন্ত হয়ে উঠছে। গ্রামের লোকদের বলে দেয়া হয়েছে আমার কিছু হলে সকলে যেন এই গ্রাম ত্যাগ করে। কি করে আটকাব একে?


ডাইন সুহার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবার পর ৩৪ ঋতুচক্র স্পর্শহীন কাটাতে হবে সেই পুরুষকে। তাহলেই একমাত্র পিশাচের আগমন আটকানো যাবে। আর ডাইন সুহারা মৃত্যু ঘটবে। কিন্তু কে আছে, যে এই মোহময় সৌন্দর্যই থেকে বাঁচাতে পারবে নিজেকে ? �

আজ সুহাসিনীর সাথে আমার ছোট ছেলে রিয়াদের বিয়ে। ডাইনির সাথে ছেলের বিয়ে দিচ্ছি। সব মায়েরা সন্তানের সুস্থতা চায়। কিন্তু আমি চাই না। হয়ত প্রকৃতি আমাকে বড় কোন স্বার্থের জন্যই এমন সন্তান দান করেছে।


৩৪ , ৩৪ , ৩৪ 

যে কোন ভাবে সুহাসিনীর সাথে কোন শারীরিক সম্পর্ক ছাড়া রিয়াদকে তার স্ত্রীর ৩৪ ঋতু চক্র পার করাতে হবে। রিয়াদ আমার বাবা, তোমার মা তোমাকে নিয়ে গর্বিত। তুমিই এখন একমাত্র ভরসা। ��নিজের স্বামীর ঘর ছেড়ে সুহারা কোথাও যাবার ক্ষমতা রাখে না। এমনকি নিজ স্বামীর কোন ক্ষতি সাধন করারও ক্ষমতা রাখে না। সুতরাং এই বাড়িতে আজ থেকে বাইরের পুরুষ আসা নিষিদ্ধ। সুহাসিনীকে অস্পৃষ্ট রাখতে হবে যে করেই হোক। তা না হলে ওর ওপর করা সকল বান নষ্ট হয়ে যাবে। ওর দৃষ্টি যেন কোন পুরুষের নজরে না আশে। ও তার দৃষ্টি দিয়ে বশ করে ফেলে, দৃষ্টি ওর প্রধান হাতিয়ার।


এক অন্ধ প্রেত শাসককে সুহাসিনীর পাহারাদার হিসেবে নিয়ে আশা হয়েছে। চোখ খুব খারাপ জিনিস। এই চোখ দিয়েই ওরা মস্তিষ্কে ঢুকে যায়।


অন্ধকে নির্দেশ দেয়া ছিল কোন পুরুষ সুহাসিনীকে দেখা মাত্র তাকে হত্যা করার, কিন্তু নিজের ছেলেকে খুন করার মতন উদার আমি হতে পারলাম না।


সুহাসিনীর নজর ফরহাদের উপর পরেছে, যে করেই হোক ওকে বাঁচাতে হবে। সুহাসিনী একবার ওর কাছে গেলে আর ওকে আটকানো যাবে না।


নিজের ঘরের বানানো বানটা ছেলের ঘরে দিয়ে দিলাম। আমার ছেলের আমার উপর অনেক রাগ। ও কেন এল এখানে। আমি যেই দায়িত্ব নিয়েছি সেঁটা হয়ত আর শেষ হবে নাকি জানি না। মনে হচ্ছে আমি হেরে যাব।


যখন কোন খারাপ শক্তির উদয় ঘটে তাকে দমন করার জন্য একটা ভাল শক্তি সৃষ্টি হয়। যাবার আগে এই একটাই সান্ত্বনা।


আমি একটার পর একটা পাতা অপ্রকিস্থের মতন ওলটাতে লাগলাম। লেখা গুলি আমার মায়ের। লেখাটা পড়েই আমার চোখ বেয়ে অশ্রু অনবরত পড়তে আরাম্ভ করল। মায়ের মৃত্যুর পর এখন আর কে আছে যে বাঁচাবে আমাদের।


হঠাৎ ঘরের বাইরে এক বিকট আওয়াজ শুনতে পেলাম আমরা। দরজা ফাঁক করে উঁকি দিতেই সুহাসিনীকে দেখে কলিজা কামড় দিয়ে উঠল আমার। ও এমন ভয়ানক রূপে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল যা দেখে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হতে লাগল। আমি সাথে সাথে দরজা বন্ধ করে দিলাম। সুহাসিনীর কেমন যেন একটা কুৎসিত আওয়াজ করতে করতে দরজার বাইরে ঘুর ঘুর করতে লাগল।


আমি যে ঘরে অবস্থান করছি সেখানে একটা পিশাচ মূর্তি আর আমার দরজার বাইরে ডাইন। আমি এই বাড়ির বাইরে বের হতে পারব না কারণ সুহাসিনী তাহলে আমার সন্তানদের মেরে ফেলবে। মারিয়াকে মেরে আমার দেশের বাইরে যাওয়া বন্ধ করেছে সে। আতঙ্কে আমার হৃদস্পন্দন যেন থেমে যাবে যাবে করছিল। মায়ের লেখা গুলির দিকে আবার তাকালাম আমি। যার শেষে লেখাটা ছিল।


“যখন কোন খারাপ শক্তির উদয় ঘটে তাকে দমন করার জন্য একটা ভাল শক্তি সৃষ্টি হয়। যাবার আগে এই একটাই সান্ত্বনা।”


তারপর অন্ধের দিকে তাকালাম, আমি জানি না কি করতে হবে আমাকে। কিন্তু এই সময় হাল ছাড়লে চলবে না, যে করেই হোক এই বাড়ির ভেতর থেকেই রিয়াদের পাশে ৩৪ চক্র পার করাতে হবে এই ডাইন কে। এই বিপদ থেকে মুক্তির এটাই এক মাত্র পন্থা, মৃত্যুর আগে আর আমার স্বপ্নে মা এই ইঙ্গিত করেছেন। অন্ধ চাচার হাত থেকে লাল কাপড়টা শক্ত করে শক্ত করে চোখে বেঁধে নিলাম আমি। দীর্ঘ ৩৪ মাস এই কাপড় বেঁধে অন্ধের মতন থাকতে হবে আমাকে। যে করেই হোক।


২ যুগ পর…


নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে জার্মানিতে ভাই রিয়াদ আর ২ সন্তান নিয়ে বেশ ভালোই আছে ফরহাদ। এক মারাত্মক সংকটময় অতীত ফেলে এসেছে সে। সেদিন সকালে কফির মগে চুমুক দিতে দিতে টিভি দেখছিল ফরহাদ। হঠাৎ করেই একটা খবরে চোখ আটকে গেল তার।


“বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বহু বছর আগের এক মূর্তি উদ্ধার করেছে প্রত্নতত্ত্ববিদরা। গবেষকরা বলছেন এই মূর্তি না হলেও দুই থেকে তিন হাজার বছর আগের। মূর্তিটির অবয়ব এতটা বীভৎস যে প্রত্নতত্ত্ববিদরা মনে করছেন পূর্ব যুগের কোন গোষ্ঠীর ধর্ম যাজকরা হয়ত কোন অপশক্তির থেকে বাঁচার জন্য তৈরি করেছিল এই মূর্তি। মূর্তিটির চোখে একটা লাল কাপড়ের আবরণ দেয়া। দেশ এবং দেশের বাইরে বেশ চাঞ্চল্য বিরাজ করছে মূর্তিটিকে ঘিরে”


খবরটা শুনে কলিজা শুকিয়ে গেল ফরহাদের। নিঃশ্বাস জোরে জোরে পড়তে আরাম্ভ করল তার। এমন সময় টিভিতে রিপোর্টার মেয়েটাকে খেয়াল করতেই হাত থেকে কফির মগটা পড়ে ভেঙ্গে গেল।


কাল কোঁকড়া চুলের মেয়েটার চোখ গুলি নীল বর্ণের, মনে হচ্ছে যেন ওর দিকেই যেন তাকিয়ে আছে সে।


সমাপ্ত…

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন