গল্প- সুহাসিনী ২ সুহার পর্ব - ১

সুহার পর্ব - ১ 



অপশক্তির আনুগত্য, কাল জাদু চর্চা অথবা শয়তানের উপাসনা এই কর্মকাণ্ড গুলো ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল সেটা সঠিকভাবে বলা বাহুল্য।


স্বার্থ আর লোভ এই দুই হাতিয়ার ব্যাবহারের মাধ্যমেই মানুষকে আকৃষ্ট করা হত এই অপশক্তির চর্চায়। 

১৫০০ শতাব্দী থেকে ১৬৬০ শতাব্দী এই সময়কালে ইউরোপে প্রায় ৮০ হাজার নারীকে আগুনে পুড়িয়ে অথবা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছিল এই উইচক্রাফট অথবা কালজাদু চর্চার অভিযোগে। কিন্তু পৃথিবীতে এই চর্চা শুরু হয়েছিল তারও অনেক আগে থেকে।


ডেমোনোলজি অথবা পিশাচতত্ত্ব যাই বলা হোক না কেন এই চর্চা প্রথম শুরু হয় শয়তানের সাথে মানুষের শারীরিক সম্পর্কের দ্বারা। আর পিশাচতত্ত্বে এই চর্চাকারীদেরকেই ডাইন বলে আখ্যায়িত করে। জোরপূর্বক অথবা স্বেচ্ছায় শয়তানের সাথে শারীরিক সঙ্গম ডাইনদের জন্য খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার ছিল। নিজের শারীরিক চাহিদা মেটাতে নয় বরং মানব জাতিকে কুলুসিত করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। এরা সেই মানুষ যারা নিজেদের বিভিন্ন স্বার্থ উদ্ধারের উদ্দেশ্যে ভিন্ন কিছু ভাষা তথাকৃত মন্ত্রের দ্বারা শয়তানকে নিজের কাছে আসার আহ্বান জানত।


এই পিশাচ বা প্রেতের মধ্যে থেকে অজ্ঞাত, ভিন্ন ধর্মী আর ভয়ংকর এক পিশাচ “সুহার”। তার এই নাম ডাইন সম্প্রদায় থেকেই পাওয়া যায়। এই পিশাচকে নিয়ে যেমন আতঙ্ক রয়েছে ঠিক তেমনি রয়েছে দ্বিমত। প্রেত শাসকদের অনেকেই একে নারী বলে সম্বোধন করে যার পিছনে রয়েছে এক সুবিশাল ইতিহাস।


জার্মানি 

সময় ৩০০ থেকে ৪০০ খিঃ। 

বর্তমানে The Black Forest নামক জংগলের পার্শ্ববর্তী কোন এলাকা।

অনেকেই এই বনের নাম Black Forest হবার কারণ হিসেবে এই বনের ঘনত্বকেই দায়ী করেন। এটা এতই ঘন একটি জংগল যে প্রখর দিনেও সূর্যের আলো এর মাটি অব্দি পৌছাতে পারে না। কিন্তু তবুও একটা সময় এই বনকে ঘিরেই সেখানে গড়ে উঠেছিল বেশ কিছু বসতি। পুরুষ, নারী, শিশু, বৃদ্ধ সকলে মিলেই একটা বিশাল সমাজ ছিল সেখানে। আর এই জংগলের ভেতরেই কোন এক স্থানে ছিল পিশাচ সুহারের অবস্থান। সুহার কিভাবে এখানে এসেছিল সে বিষয়ে কারওই কোন প্রকার ধারনা নাই। মনুষ্য জগতে আসার জন্যে হন্য হয়ে ছিল এই পিশাচ সুহার। কিন্তু তার এই পৃথিবীতে আসার ধরন ছিল একদমই আলাদা। কোন নারীর আহ্বাবানের মাধ্যমে পৃথিবীতে আসতে পারত না সে, কারণ সন্তান জন্ম দেবার মতন পুরুষালী ক্ষমতা তার ছিল না।


একদিন Black Forrest এ এক বিশাল দাবানলে জংগলের গাছপালা, প্রাণী থেকে শুরু করে পুড়ে যায় তার আশেপাশের বসতি গুলো। বিশাল ক্ষতি সাধিত হয়েছিল সেই দুর্যোগে, মারা গিয়েছিল বহু মানুষ। 

কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে এই দাবানলের মধ্যে পড়েও প্রাণে বেচে গিয়েছিল একদল কুমারী নারী। যদিও সম্পূর্ণ রূপে ঝলসে গিয়েছিল তাদের সমস্ত শরীর ও চেহারা। বলা হয় এই কুমারী নারীদের সকলেই ছিল বিবাহ যোগ্য বয়সের মধ্যে। যদিও এই নারীদের সংখ্যা কত ছিল সেটা অজ্ঞাত।


সেদিন এই নারীরা দাবানল থেকে বেচে গেলেও মানুষের কাছ থেকে বাঁচতে পারেনি। তাদের পোড়া কুৎসিত চেহারার কারণে অনেক দিন পর্যন্ত তাদেরকে একঘরে করে রাখা হলেও একটা সময় এলাকার মানুষজন তাদের ভয় পেতে আরাম্ভ করে। এমনকি অনেকই প্রশ্ন তোলে, যে দাবানলে তাদের পরিবারের কেউই বাঁচল না! সেখান থেকে শুধু তারাই কিভাবে বেচে এল? বেচে যাওয়াটাও যেন তাদের দোষ হিসেবে গণ্য হওয়া শুরু করেছিল সবার কাছে। সমস্ত এলাকার মানুষ একটা সময় চলে গেল তাদের বিপক্ষে।


সরাসরি নিজেদের হাতে তাদেরকে না মারলেও এক কুৎসিত ষড়যন্ত্র করেছিল এই এলাকার মানুষেরা। জোর পূর্বক বসতি থেকে বের করে দিয়ে তাদের জংগলে রেখে আসার নোংরা পরিকল্পনা করে তারা। আর সেই পরিকল্পনা আনুযায়ী কাল অন্ধকাররাচ্ছন এক রাতে সকলে মিলে এই অসহায় নারীদের ফেলে আসে হিংস্য বন্য প্রানিতে ভরা জংগলের মাঝে। সেরাতে এই নারীদের চিৎকার আর বাঁচার আর্তনাদে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল The Black Forrest। মানুষের ধারনা ছিল এই ভয়ঙ্কর জংগলে তারা কতদিনই বা বেচে থাকবে।


কিন্তু তারা বেচে ছিল, আর সন্ধান পেয়েছিল পিশাচ সুহারার। একটা চুক্তির বিনিময়ে পিশাচ সুহারার কাছে তারা সকলেই নিজেদেরকে সমর্পণ করে দিয়েছিল। আর এই চুক্তির বিনিময়েই সুহারা তাদের সবাইকে নিজ বংশভূত করে নিয়ে, দান করেছিল অপার সৌন্দর্য্য। আর সেই চুক্তিটি ছিল সুহারার মুক্তি চুক্তি।


এই নারীদের মধ্যে থেকে যে কোন একজন নারীকে মনুষ্য সন্তানের জননী হতে হবে। তারপর সেই মনুষ্য সন্তানের ভ্রূণকে পেটে ধরে রাখার ৩৪ দিনের মাথায় বিসর্জন দিতে হবে সুহারার কাছে। তাহলেই একমাত্র সুহারা পৃথিবীতে আগমন করতে পারবে। আর এই সম্পূর্ণ কার্যক্রম সম্পাদন করতে হবে সুহারার উপস্থিতিতে অর্থাৎ তার সামনে।


অনেকেই মনে করে, যেহেতু সুহারা একজন নারী তাই সে কোন ভ্রূণকে ৩৪ দিনের মাথায় নিজের করে নিয়ে তার আত্মা হননের মাধ্যমেই পৃথিবীতে নিজের আগমন ঘটাতে পারে।


~


কেটে যায় বেশ কিছু বছর… 

তারপার হঠাৎ একদিন আড়াল থেকে অপরূপ সুন্দরী কিছু নারীকে জংগলের ভেতর যেতে দেখে তাদের আনুসরন করে এই এলাকার কয়েকজন পুরুষ। এটাই ছিল ডাইন সুহারাদের সর্বপ্রথম মানুষ সম্মোহন। তারপর থেকে এই ঘটনা যেন বিষপূর্ণ হয়ে ওঠে পুরো সমাজে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই গহীন বনের মাঝে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে থাকে অনেকেই, শুধু মাত্র তাদের স্বপ্নের নারীর সাথে বসবাসের উদ্দেশ্যে। নীল চোখ আর ঘন কাল কোঁকড়া চুলের একদল নারীর সৌন্দর্যের মোহে The Black Forrest এলাকার কিছু পুরুষেরা যেন উন্মাদ হয়ে উঠেছিল সে সময়।


আর এই নারীরাও সেই পুরুষদেরকে নিজেদের আপন করে নিয়েছিল, এক ভয়ংকর স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে যা সম্পর্কে কোন ধারনা ছিল না কারোরই। 

আর এভাবেই একদিন এই পিশাচ সুহারার বংশভূত ডাইনদের মধ্যে থেকে এক নারীর পেটে আবির্ভাব ঘটে একজন মনুষ্য সন্তানের। আর তার ঠিক ৩৪ দিন পর, The Black Forrest আরও একবার প্রকম্পিত হয়েছিল মানুষের আহাজারিতে।


সেদিন ভোর হবার ঠিক কিছুক্ষণ আগে, নিজের সদ্য জন্ম গ্রহণ করা বাচ্চাটার চোখের দিকে তাকিয়ে যেন নিজেই ঘাবড়ে গিয়েছিল তার মা। হঠাৎ করেই কেমন যেন পৈশাচিক ঘোলা হয়ে গেল তার সন্তানের চোখ গুলো, তার পরের মুহূর্তেরই তার সন্তান একদম নিস্তেজ হয়ে পড়ল। ভয়ে কেঁপে উঠে নিজ সন্তানের কাছে যেতেই তাকে মৃত অবস্থায় দেখে চিৎকার করে উঠেছিল তার মা। শুধু এই একজন নয়, সেদিনের পর থেকে সেই এলাকায় নতুন জন্ম গ্রহণ করা শিশু গুলো এক একজন করে একই ভাবে মৃত্যু বরন করতে আরাম্ভ করে। 

যদিও এর কারণ তখন পর্যন্ত কেউই জানত না। কিন্তু ভয়ে বেশিরভাগ মানুষই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে থাকে।


এদিকে পিশাচ সুহার আর তার বংশভূত ডাইনরাও বসে ছিল না। ধীরে ধীরে তারাও ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। সেই সাথে শুরু করে তাদের অপশক্তির বিস্তার। আর এভাবে চলতে চলতে এমন একটা সময় এসে দাঁড়ায় যখন রাস্তায় রাস্তায় বাচ্চা শিশুর লাশের মিছল আর তাদের মায়েদের চিৎকারের আওয়াজে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে জার্মানির সমস্ত আকাশ বাতাস।


বেশ দেরী করে হলেও সেসময় এই অপশক্তির দমনে আদা-জল খেয়ে নেমেছিল প্রেত শাসকেরা। প্রেত শাসকেরা এমন এক গোষ্ঠী যাদের আবির্ভাব ঘটেছিল অপশক্তি চর্চা শুরুর পর থেকেই। এক্সরসিজম আর ডেমোনোলজি এই দুই বিপরীতধর্মী তত্ত্বেই তাদের এই পরিমাণ পারদর্শিতা ছিল যে যার মাধ্যমে তারা দমন আর নিরসন করত এই অপশক্তির বাহকদের। ডাইন, পিশাচ আর অপশক্তির বাহকদের কাছে প্রেত শাসক নামটা ছিল এক আতাঙ্ক। কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল একটা ব্যাপার, এই পিশাচ সুহারার সম্পর্কে সে সময়কার প্রেত শাসকদের সকলেই ছিলেন একদমই অজ্ঞ। 

আর তাই এই ভয়ংকর সঙ্কট থেকে মুক্তি পেতে প্রেত শাসকেরা ছড়িয়ে পড়তে থাকে চারিদিকে, কোন না কোন উপায় কোথাও না কোথাও তো অবশ্যই আছে। আর সেই উপায় খুঁজতে খুঁজতে প্রেত শাসকদের একটা দল হাজির হয় The Black Forest এলাকায়। যেখানেই জন্ম হয়েছিল এই পিশাচের।��~


সময় তখন শীতকাল। কুয়াশায় ঘেরা চারিদিক। শীতকালে এখানে দিন আর রাতের পার্থক্য আছে বলে মনে হয় না। এলাকায় প্রবেশের পর কিছু বসতি চোখে পড়লেও সবগুলোই ছিল জনমানব শূন্য, দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় এখানে মানুষের বসবাস অনেক দিন আগে থেকেই নেই। বসতি গুলো বনের পাশেই যত সম্ভব খোলা স্থানে করা হয়েছিল। বসতির চারপাশে আগুণের উনুন থেকে মশাল জ্বালিয়ে বনের ভেতর রওনা হয় তারা।


জংগলের একটা নিজস্ব ডাক আছে, গা ছমছম করা একটা আওয়াজ সর্বদাই চলতে থাকে এখানে। অনেকক্ষণ চলার পর এই আওয়াজের মধ্যে নিজেদের পায়ের শব্দ ছাড়াও আরও একটা পায়ের শব্দ শুনতে পেল শাসকদের এই দলটি। শব্দটা শোনা মাত্রই থেমে গেল সবাই। পায়ের আওয়াজটা প্রতিধ্বনিত হতে লাগল চারপাশে। কিছুক্ষণ পর সবাই বুঝতে পারল এটা কোন প্রানির পায়ের শব্দ না, এটা দুপায়ে হাঁটা কোন মানুষের পায়ের শব্দ। কেউ যেন তাদের আসে পাশে ছোটাছুটি করছে।


“সবাই কাপড় দিয়ে নিজেদের চোখ বন্ধ করে ফেল, এই আওয়াজকে কান দিয়ে আনুসরন করতে হবে, চোখ খোলা রেখে নয়।” শাসকদের দলটির হাকিম সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল। হাকিমের কথা আনুযায়ী সকলে নিজেদের চোখ বেঁধে শব্দটা অনুসরণ করতে আরাম্ভ করল। কিছু দূর যেতেই তারা বুঝতে পারল আওয়াজটা ওদের জংগলের গহীনে নিয়ে চলছে।


অনেকক্ষণ চলার পর হঠাৎ ই থেমে যায় শব্দটা। শাসকদের দলের হাকিম সবাইকে একত্র করে নিজেদের চোখের বাঁধন খুলতেই যেন এক বিশাল ধাক্কা খান। কুয়াশা ঘেরা ঘোলা অন্ধকারাচ্ছন পরিবেশে মশালের আলোয় তিনি অনেক গুলি মৃত লাশ দেখতে পায়। লাশ গুলোর গলায় দড়ি দিয়ে বনের গাছে ঝুলিয়ে রাখা ছিল। হাকিম তার মাসালের আলো দিয়ে সামনে তাকাতেই যেন আর স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। যত দূর চোখ যায় এই একই ঝুলন্ত লাশের দৃশ্য। দলটির হাকিম একটা লাশের গায়ে হাত দিয়েতেই শিউড়ে উঠলেন তিনি। 

তিনি কি দেখেছিলেন সেটা না বললেও চিৎকার করে একটা হুমুক করলেন সবাইকে,

“আমি না বলা পর্যন্ত এখানে একজনও তার চোখের বাঁধন খুলবে না, যদি এখানে সবার মৃত্যু হয় তাহলে এই বাঁধন পড়া অবস্থায়ই মৃত্যু হবে” 

হাকিমের এই কথায় দলটির সকলেই বুঝে গিয়েছিল সম্ভবত এখানেই তাদের মৃত্যু হয়ে যাবে, তা না হলে এভাবে এই কথা হাকিম কখনই বলতেন না। সুহার আর তার ডাইনের এলাকা থেকে প্রাণে বেচে আসা যদিও অসম্ভব ছিল, কিন্তু প্রেত শাসকের এই দলও কোন সাধারণ মানুষের দল ছিল না। হাকিমের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুপণ করে নিয়েছিল দলের সবাই আর অগ্রসর হয়েছিল সেই স্থানে যেখানে ছিল পিশাচ সুহারার অবস্থান।


মাটি থেকে দেড় হাত উঁচু একটা পাথরের ডিবির সামনে এসে দাঁড়াতেই মাংস পোড়া গন্ধ নাকে এসে লাগল সবার। গন্ধটা এতটাই তীব্র আর উটকো ছিল যে মনে হচ্ছিল ভুঁড়ি যেন উল্টে যাবে। ডিবিটার আর একটু সামনে যেতেই প্রেত শাসক দলের হাকিম অনুভব করলেন একজন নয় বরং বেশ কিছু চোখ যেন শকুনের মতন তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।

চলবে..................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন