সুহার পর্ব – ২
চোখে আটকানো কাপড়টার ভাঁজের খুদ্র ফাকা দিয়ে বাইরে তাকাতেই এক কোমল অনাবৃত নারী শরীর চোখে পড়ল তার। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেয়েটার অনাবৃত দেহটা হারিয়ে গেল মুহূর্তেই। মেয়েটার শরীরের স্নিগ্ধতা আর কোমলতা যেন বার বার হাতছানি দিয়ে ডাকতে লাগল তাকে।
সুনশান নীরবতার মাঝে পাশ দিয়ে কারও হেটে যাবার অনুভুতিটা তীব্র। চোখ বাধা থাকার কারণে অনুভুতি শক্তিটাই একমাত্র ভরসা। সে তার আনুভুতি দ্বারা বুঝতে পারছিল এই রমণীর স্পর্শ যেন তার আতি সন্নিকটেই রয়েছে। যাকে দেখার জন্য ভেতরে ভেতরে ছটফট করছিল সে। শত বাধা আর মানা থাকা সত্ত্বেও সব উপেক্ষা করে নিজের চোখের বাঁধন মনের অজান্তেই হাত দিয়ে নীচে খুলে ফেলল প্রেত শাসক দলের বয়কনিষ্ঠ এক যুবক।
বাঁধন খুলতেই নীল বর্ণ চোখের এক নারীকে দেখতে পেল সে, যে তাকিয়ে ছিল তার একদম চোখ বরাবর। যার ঠোটে ছিল মৃদু হাসির আভা। কিন্তু এই সম্মোহিত হাসি নজরে আসার পর মুহূর্তেরই বুকের কাছে হঠাৎ সজোরে একটা ধাক্কা আনুভব করল সেই যুবক। আর সেই ধাক্কায় সে ছিটকে পড়ল তার দল থেকে বেশ দূরে।
মাটিতে লুটিয়ে পড়া যুবক মুখ ভর্তি রক্ত নিয়ে উঠে দাড়াতেই দেখতে পেল সামনে দাড়িয়ে থাকা সেই মেয়েটা তখনও ঠিক সেভাবেই তাকিয়ে আছে তার দিকে আর তার চারিদিকের গাছের আড়াল থেকে বের হয়ে আসছে কয়েক জোড়া হাত। আর তারপর সেই হাতের অনুসরণনে আরও কিছু নারী।
সে এখন কি করবে সেটা বুঝতে না পাড়লেও এতটুকু বুঝতে পারছিল যে, অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে তার, যে ভুল শোধরাবার নয়। নিজের জানা বিদ্যা দিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করার আগেই সে লক্ষ্য করল গাছের আড়ালে থাকা নারী গুলি এমনভাবে কেপে উঠছে যেন তারা তাদের ভিতরে কাউকে আসার জন্য জায়গা করে দিচ্ছে। ব্যাপারটা ঠিক এমন ছিল যে কোন সত্তা এই নারীদের মধ্যে দিয়ে ধেয়ে আসছিল তার দিকে। আর ধেয়ে আসা জিনিসটা ঠিক যখন তার সামনে এসে দাঁড়াল, ভয়ে চিৎকার করে উঠল সে। তারপর শুধু একটা হিংস্য গর্জনের আওয়াজ।
ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটেছিল যে তার দলের কেউই কিছু বুঝে উঠতে পারছিল না সেসময়। দলের হাকিম আর অন্যান্যরা তাদের দলের একজনের চিৎকারের আওয়াজ শুনতে পেয়েছিল আর তার কিছুক্ষণ পর আবার সেই নীরবতা। যে নীরবতা সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছিল কি হয়েছে তাদের দলের একজনের সাথে। বহু…বহু... বছরের মধ্যে এটাই ছিল কোন অপ্শক্তির হাতে কোন প্রেত শাসকের মৃত্যু। যার অর্থ বুঝতে বাকি ছিল না সেখানে উপস্থিত প্রেত শাসক দলটির।
কিছুক্ষণ পর আবার সেই মাংস পোড়া গন্ধ আর তার সাথে গুমগুম করে ওঠা একটা ভয়ংকর আওয়াজ কানে আসল সবার।
~
“ত্রয়োদশ বেষ্টনী” এক্সরসিজমের এমন এক অধ্যায় যার প্রয়োগ করার পর কোন অপশক্তি দমনে আর কোন উপায় অবশিষ্ট থাকে না। এটাকে প্রেত শাসকেরা তাদের চূড়ান্ত হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার করেন। এটা এমন এক অধ্যায় যার প্রয়োগে মৃত্যু ঝুকি এতটাই বেশি যে আজ পর্যন্ত এর প্রয়োগকারীদের মধ্যে বেশীর ভাগ মানুষই বেচে ফেরেনি। প্রেত শাসকের এই দল হয়ত আগে থেকেই জানতেন তাদের এই অভিযানের শেষ পরিনতি হয়ত এটাই হবে।
ত্রয়োদশ বেষ্টনীর মাধ্যমে ১৩ জনের একটা দল একটা গোল চক্র করে দাঁড়িয়ে তার মধ্যে কোন পিসাচকে আটকে ফেলে। তারপর কিছু ভিন্ন রকমের ভাষা তথাকৃত মন্ত্রের মাধ্যমে তার উপর এক এক জন করে তেরটি পাথর নিক্ষেপ করেন। এটা কোন পিশাচকে মূর্তিবন্দী অথবা পাথরবন্ধী করার একটা প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় নিজের অর্জিত বিদ্যা শক্তির সাথে শারীরিক শক্তির ব্যাবহার করার কারণে পিশাচকে আটকে রাখা অসম্ভব প্রায়। আর এখানে এই দলের সবাইকেই এই কাজটি করতে হত সম্পূর্ণ চোখ বাঁধা অবস্থায়। কারণ একবার চোখ খুললে আসে পাশে তাদের মারার জন্য ডাইনরা ওতঁ পেতে আছে। সেদিন, সেময়, সেই পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ বেষ্টনীর প্রয়োগ মানে মৃত্যুকে অলিঙ্গন করা ছাড়া আর কিছুই নয়।
কিন্তু মানব জাতিকে রক্ষার স্বার্থে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, নিজেদের জীবন কোরবানির বিনিময়ে প্রেত শাসকের দলটি পিশাচ সুহারকে মূর্তি বন্দি করেছিলেন। জানা যায় সেদিন সেখান থেকে বেচে ফিরেছিলেন মাত্র একজন প্রেত শাসক। তার কাছ থেকেই পিশাচ সুহারার কিছু তথ্য সংরক্ষিত করা হয়েছিল।
মূর্তিবন্দী হবার পরও সুহার খোয়াবের মাধ্যমে তার বংশভূত ডাইনদের নিজের অবস্থান জানাতে পারত। তাই তার মূর্তির চোখে বেঁধে দেয়া হয়েছিল লাল কাপড়। যতদিন তার চোখে এই কাপড় থাকবে তার অবস্থান ডাইন সুহারাদের অগোচরে থাকবে। তার মূর্তিকে আরও সুরক্ষিত রাখতে একটা কাল কাপড়ের আবরণে পেঁচিয়ে রাখা হয় সেই মূর্তি, যেন কোন মানুষের মস্তিকেও তার এই মূর্তির প্রতিছবি যেতে না পারে।
পিশাচ সুহার এক যুগ অন্তর অন্তর ঠিক তাকে বন্ধী করার সময়টাতে জেগে উঠতে চায়। ঠিক পূর্ববর্তী প্রক্রিয়ায় এই পিশাচ তার বন্দি অবস্থা থেকে ফেরত আসতে পারবে।
যদি কোন পুরুষ ডাইন সুহার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ৩৪ ঋতুচক্র তার সাথে স্পর্শহীন কাটাতে পারে তাহলে সেই ডাইন সুহারার মৃত্যু ঘটবে আর তার সাথে পিশাচ সুহার আবার আটকে যাবে তার বন্দি অবস্থায়। কিন্তু কে আছে, যে সুহার এই মোহময় সৌন্দর্যই থেকে বাঁচাতে পারবে নিজেকে ?
সুতরাং যে করেই হোক সুহারার মূর্তিকে তার ডাইনদের অগোচরে রাখতেই হবে, এর কোন বিকল্প নেই।
কিন্তু মনে রাখতে হবে এই মূর্তিকে তারা খুঁজে বেড়াবে যুগ যুগ ধরে।
প্রেত শাসকদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর একেক জন একেক সময় এই মূর্তি সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। কালের বিবর্তনে এই মূর্তির ভয়ানক ইতিহাস একটু একটু করে ভুলে যেতে থাকে মানুষ। এমনকি প্রেত শাসকদের মধ্যে থেকে এই মূর্তির বেশীর ভাগ ইতিহাসই বিলীন হয়ে যায়। থেকে যায় নামে মাত্র কিছু বিবরণ।
তারপর সুহার মূর্তি এই বন্দি অবস্থায় এক এক দিন করে কেটে যায় বহু বহু যুগ...
~
সুহারার এই মূর্তি হাত বদল হতে হতে একদিন এসে পৌঁছে বাংলাদেশের এক অঞ্চলের এক প্রেত শাসকের কাছে যার নাম আজমাল। আজলাম তার বাবার কাছ থেকে এবং তার বাবা তার দাদার কাছ থেকে বংশ পরম্পরায় এই উপাদি অর্জন করেছিলেন। তার সাথে সাথে আজমাল এই ব্যাপারে বেশ বিদ্যাও হাসিল করছিলেন। তার এলাকায় তার পরিবারের বেশ প্রভাব ছিল। শুধু তার এলাকায় নয় এলাকার বাইরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক মানুষই তার কাছে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক বিষয়ে সাহায্য নিতে আসতেন।
সুহারার মূর্তি তার হেফাজতের আনার আগ পর্যন্ত, তার জীবন তার স্ত্রী মনাইকা আর সন্তান ফরহাদকে নিয়ে বেশ ভালই ছিল। কিন্তু এই মূর্তি যেন অভিশাপ নিয়ে এসেছিল তার পরিবারে।
আজমলের বড় ছেলে ফরহাদের বয়স দুবছরের মাথায় তার ছোট ছেলে রিয়াদের জন্ম। এক দিন রাতে আজমাল একটা বিদঘুটে স্বপ্ন দেখে উঠে চিৎকার করে উঠেছিলেন। সে রাতে তিনি একদম ঘেমে ভিজে গিয়েছিলেন। তার স্ত্রী তাকে এতটা ঘাবড়ে যেতে দেখেনি কখনো। বার বার জিজ্ঞাস করার পরও তিনি তার স্বপ্নে কি দেখেছিলেন সেটা তার স্ত্রী জানাননি। সেদিনের পর থেকে আজমাল তার কাছে রেখে যাওয়া মূর্তিটাকে নিয়েই বেশীর ভাগ সময় কাটাতে শুরু করেন। সেদিন রাতে স্বপ্নে আজমাল কি দেখেছিলেন সেটা জানা না গেলেও, সেদিনের পর থেকে আজমালের স্ত্রী মনাইকার জীবনও পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল সারা জীবনের মতন।
আজমালের স্ত্রী মনাইকার কোন প্রকার ধারনাই ছিল না এই প্রেত শাসন সম্পর্কে। আর সাধারণত নিজের পরিবারের লোকজনকে এই কাজের বাইরেই রাখত সবাই, আজমালও এতদিন সেটাই করেছিলেন। কিন্তু সেরাতের পর থেকে আজমাল তার স্ত্রীকে বলতে গেলে প্রায় জোর পূর্বক এই বিদ্যা শেখাতে আরাম্ভ করেন, কেন সেটা তার স্ত্রী তখন পর্যন্ত জানতেন না।
“- তোমার ছোট সন্তান রিয়াদ সম্ভবত মানসিকভাবে স্বাভাবিক নয়।
-যখন কোন খারাপ শক্তির উদয় ঘটে তাকে দমন করার জন্য একটা ভাল শক্তি সৃষ্টি হয়।”
শুধুমাত্র এই দুটো কথা বলেই হঠাৎ একদিন স্ত্রী আর দুই সন্তানকে রেখে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছিলেন আজমাল। তার অধিনস্ত সকলকেই তার স্ত্রীর অদিনস্ত করে গিয়েছিলেন তিনি। মৃত্যুর আগে তার কথা আর কাজ গুলো এমন ছিল যেন তিনি জানতেন তিনি মারা যাবেন।কিন্তু কেন এবং কিভাবে সেটা তার স্ত্রীর কাছে অজানাই ছিল বহু দিন পর্যন্ত। আর সেদিনের পর থেকে এই প্রেত শাসন গোষ্ঠীতে মনাইকার সম্পূর্ণরূপে পদার্পণ ঘটে।
কিন্তু হঠাৎ একদিন বিশাল সমস্যা হয় বড় ছেলে ফরহাদকে নিয়ে, যেদিন তাকে অজ্ঞান অবস্থায় তার মা উদ্ধার করেন সুহার মূর্তির সামনে থেকে। মূর্তিটার কাল কাপড় অনাবৃত অবস্থায় দেখে তার মা বুঝতে পারেন কি হয়েছে তার ছেলের সাথে। সেদিনের পর থেকে তার ছেলের শরীর আস্তে আস্তে, দিনের পর দিন খারাপ হতে আরাম্ভ করে। সুহারার মূর্তি সম্পর্কে মনাইকার ভয় সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল।
বেশ কিছু দিন পর মনাইকা বুঝতে পারে এখানে থাকলে তার ছেলের অবস্থা তার স্বামীর মতনই হবে। তাই একদিন এলাকার স্কুলের হেড মাষ্টারকে অনুরধ করে ছেলেকে দিয়ে দেয় তার কাছে। ছেলে ফরহাদকে সেদিনই শেষ বারের মতন দেখেছিলেন তিনি।
আর ছেলেকে বিদায় দেবার পর কেটে যায় দীর্ঘ ১৯ বছর...
দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজটা শুনেই অন্য রকম মনে হয়েছিল মনাইকার কাছে। এলালার কোন মানুষের এই স্পর্ধা নাই যে তার দরজায় কড়া নাড়ে। তাই নিজে এসেই দরজা খুললেন তিনি। বহু বছর পর হলেও দরজা খুলে নিজের ছেলেকে চিনতে ভুল হয়নি তার। ছেলেকে দেখে একদম হতভম্ব হয়ে গেলেন তিনি। এত বছর পর তার ছেলে ফরহাদ এখানে কেন এসেছে, এই প্রশ্ন সে কেমন আছে,
সেটা মাথায় আসার আগেই বাজতে থাকল তার মস্তিষ্কে।
সুহাসিনীর দিকে ছেলে ফরহাদের এই দৃষ্টি মানাইকার বুকের মধ্যে যেন ঝড় বয়ে আনল।
চলবে..................
.jpeg)