পর্ব ৩
সুহাসিনী মেয়েটার শরীর থেকে হাত সরিয়ে নিলাম আমি। ওর পাশেই শুয়ে থাকা রিয়াদকে হাল্কা করে একটা ধাক্কা দিলাম। রিয়াদের অবস্থাও সুহাসিনীর মতন, একদম নিষ্প্রাণ ও ঠাণ্ডা শরীর। ওদের এই অবস্থা দেখে আমার মাথা কিছুক্ষণের জন্য কাজ করা বন্ধ করে দিল। কি করব এখন? এদিকে নীচে অন্ধ লোকটা আর আমার মায়ের ঘুমের ঔষধের প্রতিক্রিয়া কখন যে শেষ হয়ে যায় সেই দুশ্চিন্তাটাও মাথায় চেপে ধরে ছিল।আমি সুহাসিনীর মাথার কাছে গিয়ে, ওর চোখের ওপর বাঁধা লাল কাপড়টা খুলে দিলাম। কাপড়টা সরাতেই এক ঝটকায় উঠে বসল ও। নির্জীব একটা মানুষ এভাবে আচমকা উঠে বসায় আমি সামান্য ভরকে গিয়ে দুপা পেছনে সরে দাঁড়ালাম।
সুহাসিনী বেশ কিছুক্ষন চুপ করে বসে রইল, আর জোরে জোরে নি:শ্বাস নিতে থাকল। ওর মসৃণ ফর্সা অনাবৃত পিঠের দিকে আমার দৃষ্টি না চাইলেও আটকে গেল। আমি নির্লজ্জের মতন হা করে ওকে দেখতে থাকলাম। সুহাসিনীর কাজকর্ম দেখে মনে হচ্ছিল আগরবাতির ধোঁয়ায় ওর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এভাবে কিছু সময় পার করার পর সুহাসিনী হঠাৎ পেছনে ঘুরে তাকাল আমার দিকে, ও আমার দিকে তাকানোর সাথে সাথে আমি বেশ অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। আমাকে দেখে সুহাসিনী শান্তভাবে গায়ের কাল চাদরটা বুকের উপর থেকে উরু পর্যন্ত পেঁচিয়ে ওর শরীরটাকে আবৃত করে নিল। পাশেই ওর স্বামী রিয়াদ মরার মতন পড়ে ছিল, কিন্তু ও রিয়াদকে এমনভাবে উপেক্ষা করে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল যেন ও রিয়াদকে দেখেইনি। বিছানা থেকে নেমে সুহাসিনী আমার দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই কেন জানি ভঁয় করতে লাগল আমার।
ছোট ভাই আর তার স্ত্রীর শোবার ঘরে এত রাতে তার স্ত্রীর সামনে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হঠাৎ করেই অসস্থি লাগতে আরাম্ভ করল। এই অসস্থিটা আরও আগেই করা উচিৎ ছিল, করলে হয়ত বেচে যেতাম।
সুহাসিনীকে কি বলব, আমি মনে মনে সেই চিন্তা করতে থাকলাম থাকলাম? যদিও ওকে বলার অনেক কিছুই আছে। এই বাড়িতে এই উদ্ভট কর্মকাণ্ডের পিছনে কি চলছে তার উত্তর দেবার মতন মানুষ সুহাসিনী ছাড়া আর কেউই ছিল না। সুহাসিনী আস্তে আস্তে হেঁটে আমার একেবারে কাছে এসে দাঁড়াতেই আমার বুকের ভেতর হাসফাঁস করতে আরাম্ভ করল। বহু কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে আমি ওকে কিছু বলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু তার আগেই ও আমাকে নিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে ঘরের বিপরীতে ছোট্ট খুপরিটার ভেতর গিয়ে ঢুকল। সুহাসিনীর অন্ধ বাবাকে দিনের বেশিরভাগ সময়ই আমি এই খুপরিটাতে দাঁড়িয়ে সুহাসিনীকে পাহারা দিতে দেখেছি। সুহাসিনীকে আমি আবার কিছু জিজ্ঞাস করতে যাচ্ছিলাম ঠিক তখনই ও আমাকে এমন একটা কথা বলল যা ছিল আমার কল্পনার বাইরে।
আমাকে একটা সন্তান দিতে পারবেন। ও আমার চোখে চোখ রেখে কথাটা বলেছিল। তার নীলাভ দৃষ্টি আমার বুকের ভেতর গিয়ে কড়া নাড়তে থাকল। আমি আর কিছুই চিন্তা করতে পারলাম না, ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম আমি। আমি ওকে আমার ঘরে নিতে চাইলাম কিন্তু ও কোনভাবেই এই খুপরি থেকে বের হল না। কেন? সেই প্রশ্ন ও চিন্তা কোনটাই আমি করিনি তখন। সুহাসিনীর কাছ থেকে এতটা সরাসরি এমন প্রস্তাব পেয়ে আমি হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলাম। প্রেম বিনিময়ে অন্ধের মতন বাস্ত হয়ে গিয়েছিলাম আমি।
~
পরদিন সকালে একটা কর্কশ কান্নার আওয়াজে ঘুম ভাঙল আমার। ঘুম থেকে উঠে নিজেকে সেই খুপরির ভেতরেই অবিস্কার করলাম আমি। কাল রাতে কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম সেটাও মনে করতে পারছিলাম না। মাথাটা ঝিম ঝিম করছিল, গতকাল রাতের ঘোর কাটতে বেশ সময় নিল আমার। বাড়ির নিচতলা থেকে অনবরত একটা কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই সারা ঘর ভর্তি মানুষ দেখে বেশ অবাক হলাম আমি। এই বাড়িতে তো কেউ এমনি এমনি আসার কথা না। আমাকে দেখে মানুষগুলি যেন ভূত দেখছে এমন করে সরে যেতে থাকল। আমি অবাক হয়ে আর একটু সামনে এগুতেই সিঁড়ি থেকে সামান্য দূরে মায়ের ঘরের দরজাটার দিকে চোখ পড়ল। আর সাথে সাথে আমার মাথাটা গুলিয়ে উঠল। দরজার সামনে লম্বা একটা কাল কাপড়ে ঝুলছিল তার লাশটা। জিব্বাটা বের হয়ে একেবারে গলা পর্যন্ত ঝুলে পরেছে। শরীরের বিভিন্ন অংশে ছেঁড়া আঁচড়ের দাগ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। সুহাসিনীর অন্ধ বাবাকে দেখলাম হাউ মাউ করে মায়ের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। তার কান্নার আওয়াজে যতটা না কষ্ট প্রকাশ পাচ্ছিল ভঁয় প্রকাশ পাচ্ছিল তার থেকে অনেক বেশী। মনে হচ্ছিল সে ভঁয়ে কাঁদতে কাঁদতে মরেই যাবে। তার সাথে আমিও বেশ ভয় পাচ্ছিলাম। যদিও আমার ভঁয়ের কারণ ছিল ভিন্ন। গতকাল রাতের কথাটা এখন পর্যন্ত আমি ছাড়া আর কেউই জানত না। আমি যতটা না ভঁয় পাচ্ছিলাম মায়ের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুতে তার থেকেও বেশী ভঁয় পাচ্ছিলাম ফেঁসে যাবার আশঙ্কায়। হঠাৎ করে মায়ের হাতের দিকে তাকাতেই আশ্চর্য হলাম আমি। আঙ্গুল দিয়ে তার ডান হাতে তিন আর বাম হাতে চার ইশারা করা ছিল। মনে হচ্ছিল মৃত্যুর আগে সে কিছু একটা বোঝানোর জন্য এই ইশারা করেছিল।
বাড়িতে আসা মানুষ গুলি আমাকে এমনভাবে দেখতে লাগল যেন এই মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী। ওনার মতন এমন অদ্ভুত মানুষের আত্মহত্যা করাটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু আমি ছাড়া কেউ সেটা মনে করছিল না এই অত্র ভুবনে। আমি সুহাসিনীকে দেখতে উপরে গেলাম, রিয়াদের পাশে একদম স্বাভাবিকভাবে বসে ছিল ও,আমাকে দেখে ও মিটমিট করে হাসতে লাগল, আর গুণ গুণ করতে লাগল। হঠাৎ সেদিন সুহাসিনীকে কেমন অদ্ভুত লেগেছিল আমার।
আমার সমস্ত ভয় দূর করে দিয়ে মায়ের লাশটা কোন প্রকার ময়না তদন্ত ছাড়াই দাফন করা হল সেদিন দুপুরের পর। এই বাড়িতে এখন আমি, রিয়াদ, সুহাসিনী আর সুহাসিনীর অন্ধ বাবা। হঠাৎ করেই ঘটনা গুলি এত দ্রুত ঘটতে লাগল যে আমি কোন সুরাহা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল, আমি আমার স্ত্রীর সাথে কথা বলার জন্য ঘরের বাইরে বের হলাম। ওর সাথে কথা বলতে বলতে কিছু দূর হেঁটে এই গ্রামের বড় রাস্তাটায় উঠতেই দেখলাম আমাদের বাড়ির আশে পাশে সব লোক নিজেদের মালপত্র নিয়ে কোথায় যেন চলে যাচ্ছে। আমাকে দেখে তারা যেন নিজেদের গুটিয়ে নিল, আর হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল। আমি আরও একটু সামনে গেলাম, দেখলাম এই প্রস্থান করতে থাকা মানুষের পরিমাণ এক জন দুই জন নয়, পুরো গ্রাম ধরে মানুষ চলে যাচ্ছে। আমার পিলে চমকে উঠল এই অবস্থা দেখে। আমি দ্রুত বাড়ির দিকে রওনা করলাম। সুহাসিনী আর ওর বাবার সাথে কথা বলতে হবে।
~
ঘরে ঢুকেই সোজা অন্ধের কাছে চলে গেলাম আমি, বেশ উত্তেজিত ভাবেই জিজ্ঞাস করলাম তাকে
--কি হচ্ছে এসব?
--গ্রামের লোকেরা কোথায় চলে যাচ্ছে ? আমার প্রশ্নের কোন উত্তর দিলেন না তিনি।
আমি আবার প্রশ্ন করলাম “কেন রাতে সুহাসিনী আর রিয়াদকে এমনভাবে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিল”
এই প্রশ্নটা করতেই উনি আমার কাছ থেকে চলে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন, তারপর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলেন। রাগে আমার শরীর কাঁপতে লাগল। আমি বেশ জোরে চিৎকার করে বললাম “নিজের মেয়েকে একটা প্রতিবন্ধীর সাথে বিয়ে দিয়েছেন কোন স্বার্থে সেটা অন্তত বলে যান” আমার এই কথা শুনেই উনি থেমে গেলেন, তারপর ঘার ঘুরিয়ে মাথা নিচু করে বললেন “সে আমার মেয়ে না, সুহারা কারও সন্তান হতে পারে না” তার কণ্ঠে আতঙ্কের ছাপ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল। তার কথা শুনে আমি নির্বাক হয়ে গেলাম। আমার মনে খটকা লাগা ব্যাপারটা যে সত্যি সেটা আমার ধারনার বাইরে ছিল। আমি চলে এলাম সুহাসিনীর কাছে, অন্তত ওর হয়ত কি হচ্ছে বলবে আমাকে। রিয়াদের ঘরেই ও বসে ছিল। আমি ওর পাশে গিয়ে বসলাম, তারপর বললাম।
তোমাকে কি আমার মা জোর করে রিয়াদের সাথে বিয়ে দিয়েছে ?
আমার প্রশ্নে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল সে।
তোমাকে কি ওরা জোর করে আটকে রেখেছিল, আমার এই প্রশ্নেও সুহাসিনী হ্যাঁ বলল।
আমি ওকে নরম করে আবার জিজ্ঞাস করলাম, এই বাড়ি ছেড়ে তুমি যাবে আমার সাথে ?
আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে “না” বলল সুহাসিনী। আমি অবাক হয়ে তাকে আবার বললাম তুমি কেন আমার সাথে যাবে না। ও আমার প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না। আমি বললাম তাহলে তুমি এখানে থাকতে চাও। ও আবার আমাকে “না” বলল। আমি সামান্য বিরক্তি নিয়ে বললাম তাহলে আমার সাথে যাবে না কেন? ও চুপ । আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাস করলাম “কেন মিথ্যা বলছ ?”
সুহাসিনী আমার দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে থেকে বলল “সুহারা মিথ্যা বলে না”
ওর কথা আমি তখন বুঝতে না পারলেও মনে মনে একটা খটকা লাগছিল।
“ঠিক আছে তাহলে তুমি থাক, আমি কালই চলে যাব” এই কথা বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম আমি। যদিও এত কিছু হবার পরেও সুহাসিনীকে ছেড়ে যেতে মন চাইছিল না।
~
পরদিন সকাল ৭ টা, ঘুম থেকে উঠতেই মোবাইলে ৭ টা ফোন কল। জার্মানি থেকে আমার কলিগ চেসির ৭ বার কল করেছে। চেসির এতবার কলে একটু চিন্তিত হলাম আমি। মোবাইলর ডাটা অন করে ওকে কল দেবার আগেই ওর অষ্টম কল রিসিভ করলাম আমি। ও আমাকে কল ধরেই উত্তেজিত গলায় বলল।
--ফরহাদ বিশাল ঝামেলা হয়ে গেছে, অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেছে তোমার। আমি ওর কথার কোন কিছুই বুঝতে পারলাম না।
-- কিসের ক্ষতি ? আমি ওকে চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞাস করলাম।
-- ফরহাদ তোমার স্ত্রী মারিয়া গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। চেসির কথা শুনে আমি পুরো নির্বোধ হয়ে গেলাম, কি বলছে ও এগুলো।
--কি যা তা বলছ তুমি চেসি। আমার গলা কাঁপতে আরাম্ভ করল।
আমার কথার উত্তরে চেসি রেগে গিয়ে বলল “আমি তোমাকে যা তা বলার জন্য ফোন দেইনি ফরহাদ”
--আমি আজকেই জার্মানি আসছি চেসি, চিৎকার করে বললাম আমি।
-- তুমি এখন জার্মানি আসতে পারবে না ফরহাদ, মারিয়া একটা সুইসাইড নোট লিখে গেছে, যেখানে সে তার মৃত্যুর জন্য তোমাকে দায়ী করেছে। তুমি মারিয়ার সাথে প্রতারণা করেছ সেই কথা লেখা আছে সেই নোটে। এখানে আসলে তোমাকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করা হবে। পুলিশের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তুমি জার্মানি আসতে পারবে না। তোমার দুই সন্তান ভাল আছে। আমি ফোন রাখছি। ভাল থেক।
এক নিশ্বাসে কথা গুলি বলেই মারিয়া ফোন রেখে দিল। আর আমি ভেজা চোখে হতবুদ্ধি হয়ে বসে রইলাম। আমি যেন আমার মধ্যে নিজেকেই পাচ্ছিলাম না। কখন যে মোবাইলটাতে একটা মেসেজ এসেছে সেটাও বুঝতে পারিনি আমি। মেসেজ আসার শব্দে আমি মাথা উঁচু করতেই দেখতে পেলাম, সুহাসিনী ঠিক আমার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ওর দিকে তাকাতেই মুচকি হেসে গুণ গুণ করতে করতে রিয়াদের ঘরে চলে গেল সে।
মোবাইলের মেসেজের সিন বাটন চাপ দিতেই চেসির পাঠানো একটা ছবি স্ক্রিনে ভেসে উঠল, যেখানে মারিয়ার গলায় কাল কাপড় পেঁচানো লাশটা দেখা যাচ্ছিল। মারিয়ার গলার এই কাল কাপড়টা আমর চেনা, অতি চেনা একটা কাপড়। আমি হাঁ হয়ে নিজের মৃত স্ত্রীর ছবির দিকে তাকিয়ে রইলাম।
চলবে ...
.jpeg)