পর্ব ২
কাল কাপড়ে ঢাকা দুটি অর্ধনগ্ন শরীর জড় বস্তুর ন্যায় পড়ে ছিল বিছানার উপর। ছোট বেলায় দেখা সেই মূর্তিটার মতন, ওদের চোখ গুলি লাল কাপড় দিয়ে বাঁধা ছিল। ঘরটা বেশ ধোঁয়াটে হবার কারণে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত হবার জন্য আমি পুনরায় তাকালাম ওদের দিকে। নাহ আমার কোন ভুল হচ্ছে না, রিহাদ আর সুহাসিনীর নিষ্প্রাণ দেহ পাশাপাশি টানটান হয়ে পড়ে আছে। ঘরের ভেতর থেকে আগরবাতির ধোঁয়া আর গন্ধ আমার নাক আর চোখে বুধবুধ করে ঢুকছিল। এই গন্ধ আমার চেনা, বহু বছর আগের এক যন্ত্রণাদায়ক গন্ধ এটা।
কিন্তু সামনে ছোট ভাই রিয়াদ আর তার স্ত্রী সুহাসিনীর নড়াচড়াহীন দেহ আমকে অন্য কিছু ভাবাল। “হায় খোদা, ওরা কি জীবিত না মৃত?” চিন্তাটা মাথায় আসতেই আমি জলদি পা বাড়ালাম ঘরের ভেতরে।
ঘরের ভেতর পা রাখার আগেই মাথার পেছনে সজোরে আকস্মিক একটা লাঠির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম আমি। সাথে সাথে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এল, এই ঝাপসা দৃষ্টিতেই আমি দেখতে পেলাম কেউ একজন ঘরের দরজাটা দ্রুত বন্ধ করে দিচ্ছে। মাথার পেছন থেকে রক্তের প্রবাহটা ও টের পাচ্ছিলাম, কিন্তু হাত উঠানোর মতন শক্তিটুকু পাচ্ছিলাম না। তারপর আর কিছুই মনে নেই, সম্ভবত অল্পসময়ের মধ্যেই আমি জ্ঞান হারিয়ে ছিলাম।
~
মোবাইলের অ্যালার্ম বাজার আওয়াজে পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল আমার। ঘুমের ঘোর কাটার সাথে সাথেই আমি বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে চলে গেলাম আমার ভাই রিয়াদের ঘরে। কে জানে কি হাল ওদের? কাল রাতের কথা আমার পরিষ্কার মনে আছে। মিনিট পাঁচেক হেঁটে রিয়াদের ঘরের সামনে দাঁড়াতেই আমি একেবারে “থ” হয়ে গেলাম। রিয়াদ একদম স্বাভাবিক ভাবে একটা কাঠের চেয়ারে বসে আছে, আর তার পাশেই বসে আছে সুহাসিনী। সুহাসিনী রিয়াদের মুখের সামনে একটা পেয়ালা ধরে ওকে কিছু খাওয়াবার চেষ্টা করছিল, আর রিয়াদ ভাবান্তরহীন সামনে তাকিয়ে ছিল।
আমি কি কোন স্বপ্ন দেখছি ? নাকি গতরাতের স্মৃতিটা একটা দুঃস্বপ্ন ছিল? কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ বন্ধ করলাম আমি। গতকাল রাতের পুরো ঘটনাটা মনে করতেই আপনা আপনি মাথার পিছনে হাত রাখলাম, আর কাতরে উঠলাম ব্যাথায়। হাত সামনে আনতেই আঙ্গুলের ওপর সামান্য রক্তের ছাপটা স্পষ্ট দেখতে পেলাম । গতকাল রাতে যা ঘটেছে সেটা যে কোন দুঃস্বপ্ন ছিল না এই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম। আমার উপস্থিতি বুঝতে পেরে সুহাসিনী তাকাল আমার দিকে। আমি প্রশ্নবিদ্ধ চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। কি হচ্ছে এসব? গতকাল রাতে ওর অবস্থা আমার চোখের সামনে যেন ভাসছিল। সুহাসিনী মায়াভরা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, ওর জন্য ভেতরে ভেতরে আমি এক তীব্র যন্ত্রণা আনুভব করতে লাগলাম।
এমন সময় সুহাসিনীর বাবা নামক অন্ধ লোকটাকেও দেখতে পেলাম সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসছে। ওনার লাঠির সাথে মেঝের ঠুক ঠুক আওয়াজটা আমি আগেও শুনেছি, এই আওয়াজটাই গতকাল রাতে রিয়াদের ঘরে ঢোকার আগে আমার পিছন থেকে আসছিল। আমি তীক্ষ্ণ নজরে লোকটার লাঠির দিকে তাকিয়ে রইলাম।মুছে ফেলার চেষ্টা করা হলেও ওনার লাঠির নিচের অংশে রক্তের ছাপ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল। এইবার সমীকরণটা আমার মাথায় আসল যেটা আরও আগে আসা উচিৎ ছিল বলে আমি মনে করছিলাম।
এই সবগুলো আমার মায়ের কাজ ছাড়া আর কারও কাজ না। উনাকে আমি ছোট বেলা থেকেই চিনি। মানুষকে ভয় দেখানো তার কাছে বাচ্চার খেলা মাত্র। সুহাসিনীর মতন এমন আপরুপ সুন্দরী একটা মেয়েকে ভয় দেখিয়েই রিয়াদের সাথে বিয়ে দিয়েছে সে, তা না হলে একটা সাধারণ মেয়েও সম্পূর্ণ মানুষিক প্রতিবন্ধীকে কখনোই বিয়ে করবে না। কখনো না। আর এখন আমাকে ভয় দেখিয়ে এই বাড়ি থেকে বের করার পরিকল্পনা করেছে। প্রচণ্ড রাগে দাঁত কিড়মিড় করে উঠল আমার। ঘরে গিয়ে মোবাইল আর মানিব্যাগ সাথে নিয়ে সোজা রওনা হলাম থানার উদ্দেশ্যে। এর একটা বিহিত করতে হবে। চোখের সামনে এই সব মানা যায় না। কিন্তু আমার চোখের সামনে আরও কিছু ঘটনা আমি উপেক্ষা করে গিয়েছিলাম, সেটা একদমই বুঝতে পারিনি তখন।
~
বেশ চেঁচামেচি করে থানা থেকে একজন পুলিশ আনতে হল আমার। বাসা থেকে চল্লিশ মিনিটের হাটা দূরত্বে থানাটা। ওরা নাকি সামনের সপ্তাহে অন্য এলাকায় নিয়ে যাচ্ছে থানাটাকে, সেজন্য সবাই মহাব্যস্ত। থানার লোকেরা এই অজুহাত দিলেও আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল আমার বাড়ির ঠিকানা শোনার পর ওরা আর আসতে চাইছে না।
বাড়িতে ঢুকতেই হাতের বায়ে লম্বা একটা লবি, যার পাশাপাশি দুটো ঘর। একটা ঘর আমার মায়ের আর অন্যটা আমার ভয়ের। এই ঘরেই সেই বীভৎস মূর্তিটা দেখেছিলাম আমি। আর সেখানেই আমরা চারজন চারজন বসে ছিলাম। আমি, আমার মা, সুহাসিনীর বাবা আর থানার পুলিশ। সময় তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে প্রায় রাতের দিকে। আমি সুহাসিনীর বাবাকে উদ্দেশ্য করে পুলিশকে আমার অভিযোগ জানাতেই আমার মাকে দেখালাম উঠে দাড়িয়ে আস্তে আস্তে হেটে একটা কাল মোমবাতি জ্বালালেন। আমি লক্ষ্য করলাম আমার সাথে আসা পুলিশটি মাকে যথেষ্ট সমীহ করে চলছেন। আমি বিরক্তি নিয়ে আরও কিছু বলার আগেই আমার মা বললেন “তোমার মাথায় পাওয়া চোটটা ওনাকে দেখাও ফরহাদ। আমার মাথা ঘুরিয়ে পিছনে হাত দিয়ে পুলিশটাকে ক্ষতটা দেখাতে গিয়েই আশ্চর্য হয়ে গেলাম আমি। কিছুক্ষণ আগ পর্যন্ত রয়ে যাওয়া ক্ষতটা আর নেই। একেবারে মসৃণ ত্বকের মতন হয়ে গেছে। আমি চোখ বড় করে আমার মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। সে ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল “এখান থেকে চলে যাও ফরহাদ, এটাই সবার জন্য মঙ্গল।“ আমার সাথে আসা পুলিশটাকে দেখলাম নতজানু হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। আমি বুঝতে পারলাম এই বাড়ি কেন এই সমগ্র এলাকায় আমি একা। হঠাৎ করেই একটা আতঙ্ক আনুভব হতে লাগল আমার ভেতর। আমার মনও বারবার বলছিল এখান থেকে চলে যেতে। তখনই আমার চলে যাওয়া উচিৎ ছিল কিন্তু আমাকে আটকে রাখল সুহাসিনী। ওর আকর্ষণ আমাকে আর যেতে দিল না।
তারপর টানা দুই দিন আমি এই বাড়ির সবাইকে লক্ষ্য করতে থাকলাম। এই দুদিনের পর্যালোচনায় আরও কিছু ব্যাপার খটকা লাগল আমার কাছে। অন্ধ লোকটাকে সুহাসিনী বাবা বলে ডাকলেও সে ছিল সুহাসিনী আর এই বাড়ির একজন নজরদার। চব্বিশ ঘণ্টা সুহাসিনীকে তার নজরবন্দি করে রাখত এই লোক। আমি তার প্রতিটা কার্যক্রমে আশ্চর্য হয়ে গেছিলাম। আমাকে সুহাসিনীর কাছে পর্যন্ত ঘেঁষতে দিত না সে। আমি সুহাসিনীর কাছে গেলেই কিভাবে যেন টের পেয়ে যেত সে। শুধু তাই না এই লোকের চাল চলনের তীক্ষ্ণতা এতটা প্রখর ছিল যে, আমি তাকে সন্দেহ করতে আরাম্ভ করলাম, সে কি আসলেই অন্ধ কি না।
আরও একটা ব্যাপারে আমি বেশ অবাক হয়েছিলাম, এই বাড়িতে আমি আর আমার মা ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে যায় না। না সুহাসিনী, না রিয়াদ আর না ওই অন্ধ। সুহাসিনীকে আমি কয়েকবার ইশারা করে বাইরে আসতে বললেও সে ঘরের বাইরে বের হয়নি। এর কারণ আমার কাছে অজানা ছিল।
এক সপ্তাহের সময় নিয়ে নিজের মানুষিক চিকিৎসার জন্য দেশে এসেছিলাম আমি । আজ প্রায় চার দিন পার হয়ে গেছে। আমার স্ত্রী আজ সকালে আমার অগ্রগতির কথা জানতে চাইলে তাকে মিথ্যা বললাম আমি, আমার এখানে আরও কিছুদিন থাকা লাগতে পারে সেই কথাটাও তাকে জানিয়ে দিলাম কথার মাঝখানে। আমাকে রাতে ঘুমের আগে ঘুমের ঔষধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে ফোন রাখল সে।
আমি নিজেও জানতাম না আমি কি করতে যাচ্ছি, শুধু জানতাম নিজেকে একটা মোহে জরিয়ে ফেলেছি। ঘুমের ঔষধের কথাটা এই কয়দিন মাথায় ছিল না আমার। এটাকে যে করেই হোক কাজে লাগাতে হবে। ওই অন্ধ লোকটাকে যে করেই হোক এইটা সেবন করাতে হবে আমাকে। তাহলেই আমি সুহাসিনীর কাছে যেতে পারব আর জানতে পারব কি হচ্ছে এখানে। রাতের বেলা মা একেবারেই উপরে আসেন না। অন্ধের প্রতি অগাধ বিশ্বাস তার। এই লোকটাকে ঘুম পাড়াতে পারলে আমার কাজ হয়ে যাবে আশা করা যায়।
সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ লাগেজ গোছাতে আরাম্ভ করলাম আমি, বের হয়ে আজ রাতেই চলে যাব এমন একটা ভাব ধরলাম। আমার চলে যাবার কথা শুনেই অন্ধ তার কাজ থেকে সামান্য খেয়াল হটাতেই এই সুযোগে রান্না ঘরে গিয়ে আমি আমার কাজ করে ফেললাম। এখন শুধু অপেক্ষার পালা রাতের। আজ রাতে যদি রিয়াদের দরজার কাছে এই অন্ধ না থাকে তাহলেই সুহাসিনীর সাথে কথা বলার সুযোগ হবে আমার।
~
ঘড়ির কাটা ১২ টা পেরিয়েছে। ঘড়ির কাটার প্রতিটা শব্দ যেন আমার বুকে বাড়ি দিচ্ছিল। আমি দরজা খুলে বের হলাম। রিয়াদের ঘর পার হতেই আমার বুকটা যেন ধুঁক ধুঁক করতে লাগল। মনের মধ্যে একটা চাপা আতঙ্ক নিয়ে আমি আগে চলে গেলাম অন্ধের ঘরে, গিয়ে দেখলাম মারার মতন ঘুমাচ্ছে সে। ঔষধের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। আমার অর্ধেক ঝমেলা কমে গেল। এবার নিচে গেলাম মাকে এক ফাঁক দিয়ে দেখে আসার জন্য। ওনাকে দেখার পর যেন আমার খুশীর বাঁধ ভেঙ্গে গেল। অঘরে ঘুমাচ্ছেন উনিও। ওনাকে দেখে বেশ অবাক হলাম আমি। আর মনে মনে হাসলাম। সামান্য ঘুমের ঔষধে যার এই হাল, তাকে নাকি আবার সবাই ভয় পায়। আমি আর সময় নষ্ট না করে চলে গেলাম উপরে রিয়াদের ঘরে।
ঠিক প্রথম রাতে ওদের যেভাবে দেখেছিলাম ঠিক সেই অবস্থায় দেখলাম । ওদের এই অবস্থায় দেখে আমার নিজের কাছে বেশ অসস্থি লাগছিল। মাথা ঝেড়ে ঘরের ভেতরে গিয়ে সুহাসিনীকে ডাকলাম আমি। ওর গায়ে হাত দিতেই আমি যেন একটা ধাক্কা খেলাম। ওর সারা শরীর মৃত মানুষের মতন ঠাণ্ডা।
চলবে ...
.jpeg)